Academic and Creative Publishers' Association of Bangladesh
বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি

Article on Literature & Copyright Written by Mr. Osman Gani, President, ACPAB @ 15-07-2016



Description:

সাহিত্য ও কপিরাইট

ওসমান গনি

সাহিত্য হলো জীবনের সঙ্গে জীবনের যোগ, আনন্দের সঙ্গে অনুভবের মিলন। এজন্যই সাহিত্যকে জীবন ও সমাজের দর্পণ বলা হয়। একটি জাতির রুচি তৈরি হয় সাহিত্যের মাধ্যমে। সাহিত্যই নির্মাণ করে ব্যক্তি মানুষের জীবনযাপনের মার্জিত অবয়ব। সুস্থ, স্বাভাবিক, উন্নত সাহিত্য ছাড়া একটি জাতি কখনোই সভ্য দুনিয়ার নাগরিক হতে পারে না। সাহিত্য মানুষের আবেগ, অনুভূতি শাণিত করে, মানবপ্রেমে অনুপ্রেরণা জোগায়, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে, সর্বোপরি একজন মানবসন্তানকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। সাহিত্যহীন জীবন প্রকৃত অর্থে জীবন নয়, জীবনের খণ্ডিত রুপ মাত্র। যে সাহিত্য জীবন ও জগৎকে অর্থপূর্ণ করার জন্য জরুরি ভূমিকা পালন করছে, সে সাহিত্য সংরক্ষণ ও সাহিত্যস্রষ্টার আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান মানবসমাজের অবশ্য কর্তব্য। সাহিত্যকে লিপিবদ্ধ করলেই সাহিত্য সংরক্ষণ অনেকটা সম্ভব হয়, কিন্তু সাহিত্যস্রষ্টার সার্বিক অধিকার রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। কেন সাহিত্যকর্মের স্বত্বাধিকারীর অধিকার রক্ষা করা কঠিন সে বিষয়টি একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার। সাহিত্য ও সাহিত্যস্রষ্টা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সাহিত্যস্রষ্টা হলেন আধার, সাহিত্য হলো আধেয়। আজ সবকিছুই পুঁজির মানদণ্ডে মূল্যায়ন করার একটি প্রবণতা লক্ষণীয়। যদি আমরা পুঁজির মানদণ্ডে সাহিত্য ও সাহিত্যস্রষ্টাকে বিশ্লেষণ করি তাহলেও বলা যায়, সাহিত্য হলো পণ্য এবং সাহিত্যস্রষ্টা হলেন সেই পণ্যের নির্মাতা। প্রকাশনাশিল্প সাহিত্যকে বাজারজাতকরণের গুরু দায়িত্ব নিয়ে সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে পৌঁছে দেয় মাত্র। সব পণ্যেরই কমবেশি বাজারমূল্য আছে। পণ্য নির্মাতারও আছে মূল্য পাওয়ার সামাজিক ও নৈতিক অধিকার। কপিরাইট সাহিত্যস্রষ্টার সামাজিক ও নৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে।

কপিরাইট একটি ইংরেজি শব্দ। এর বাংলা অর্থ লেখস্বত্ব বা স্বত্বাধিকার। যেকোনো সম্পদের সঙ্গেই অধিকার কথাটা জড়িয়ে থাকে। অধিকারবিহীন সম্পদ যেমন আমরা নিজের মনে করি না, তেমনি সে সম্পদ রক্ষা করার তাগিদও খুব একটা বোধ করি না। সম্পদের ওপর প্রকৃত মালিকের অধিকার সম্পদ সংরক্ষণে ও সম্পদ ব্যবহারে মানুষকে উজ্জীবিত করে। এবার প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে সাহিত্যকে পণ্য বা সম্পদ বলা যায় কি না? সম্পদের সংজ্ঞায় সাহিত্যকে স্থান দেওয়া অর্থনীতি সমর্থন করে কি না?

অর্থনীতিতে তাকেই সম্পদ বলা হয়, যার উপযোগিতা ও বাজারমূল্য আছে। সম্পদের সংজ্ঞানুসারে সম্পদ দুই প্রকার। একটি বস্তুগত সম্পদ, আরেকটি বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। সাহিত্য বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের অন্তর্গত। এই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের তালিকায় আরো আছে সংগীত, চিত্রকলা, নৃত্যকলাসহ আরো অসংখ্য শিল্প। অর্থনীতির সংজ্ঞানুসারে সাহিত্য যেহেতু বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বা ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি হিসেবে পরিগণিত তাই সাহিত্যের ওপরে সাহিত্যস্রষ্টার অধিকার থাকবে এটাই আইনসিদ্ধ। কিন্তু আমাদের সমাজচিত্র ভিন্ন রকমের ইঙ্গিত দেয়। আমরা সাহিত্যকে ব্যবহার বা উপভোগ করতে চাই বটে, কিন্তু সাহিত্যস্রষ্টাকে মোটেই মূল্য দিতে চাই না। এমনকি তাঁর অধিকারের বিষয়টিও স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এড়িযে যাবার চেষ্টা করি।

কপিরাইট সম্পর্কে অনুন্নত দেশগুলো কেন এত উদাসীন তার অনেকগুলো কারণ আছে। যদি আমরা মোটা দাগে কতগুলো কারণ চিহ্নিত করি তাহলে দেখব কপিরাইট সম্পর্কে আমাদের অনাগ্রহ, কপিরাইটের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে আমাদের যথার্থ জ্ঞানের অভাব, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের প্রতি আমাদের অসচেতনতা এবং সৃজনশীল কাজের উপযুক্ত মূর্যায়ন না করাই প্রধান কারণ হিসেবে আমাদের সামনে এসে হাজির হবে।

কপিরাইট সাহিত্যাকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করে এবং সাহিত্যকর্মের স্বত্বধিকারীর স্বার্থকে সংরক্ষণ করে। উন্নত বিশ্বের মানুষ যেকোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদকেই যথার্থ মূল্য দিয়ে পেতে আগ্রহী। শুধু তা-ই নয়, সেই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদকে নিজের মতো করে ব্যবহার করতে গেলেও ও তারা সেই কর্মের স্রষ্টার কাছে অনুমতি নেয় বা কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁর ঋণ স্বীকার করে। অনুন্নত দেশে এসব শিষ্টাচার বালাই বলেই মনে করা হয়, কিন্তু আমরা কখনোই ভেবে দেখি না যে, যিনি সৃষ্টি করেন তাঁকে যদি আর্থিক এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান করা না- হয় তাহলে সৃজনীশীল বা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের স্রষ্টা কখনোই বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সৃজনে উৎসাহী হবেন না। যে কাজের সঙ্গে অর্থের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, যে কাজের সম্মান ও স্বীকৃতি নেই সেই কাজ করতে কোনো মানুষই আগ্রহবোধ করে না। কপিরাইট সাহিত্যের অর্থমূল্য ও সম্মান দুটোই রক্ষা করে।

কপিরাইট সম্পর্কে যাঁদের ধারণা আছে তাঁরা জানেন, কপিরাইট শুধু সাহিত্য ও সাহিত্যকর্মের স্বত্বাধিকারীর স্বার্থই দেখে না, এর সঙ্গে জড়িত সকলের স্বার্থকেই সংরক্ষণ করে। আজকাল বাজারে নকল সাহিত্যগ্রন্থের ছড়াছড়ি দেখা যায়। যাকে আমরা ইংরেজিতে বলি পাইরেটেড বুকস’। পাইরেট’ শব্দের অর্থ-দস্যুতা, বিশেষ করে জলদস্যূতা। এই দস্যুতা এখন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদকেও কুক্ষিগত করার ষড়যন্ত্র করছে। একটি পাইরেটেড বই যেহেতু লেখকের অনুমতি নিয়ে ছাপানো হয় না এমনকি যে বা যারা সেই বইটি প্রকাশ করে তারা ফাঁকি দেয় পাঠককেও। সঙ্গত কারণেই পাইরেটেড বইয়ের মান মূল (অরিজিনাল) বইয়ের মতো হয় না। যাঁরা মেডিক্যাল সায়েন্স বা প্রকৌশল বিদ্যা অধ্যয়ন করেন তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন পাইরেটেড বই কি পরিমাণ ভুল ও বিকৃত তথ্য দিয়ে তাঁদের বিভ্রান্ত করছে। যদি আমরা কপিরাইট আইন মেনে চলতাম তাহলে কিছুতেই পাইরেটেড বই কিনতাম না এবং অর্থ ও সময় অপচয় করে ভুলগ্রন্থ অনুসন্ধান করতাম না।

কপিরাইট আইন প্রায় দু’শ বছর আগে প্রণয়ন করা হয়েছে। পৃথিবীর দেশে দেশে কপিরাইট আইন এখনো প্রণয়ন করা হচ্ছে। আমাদের দেশে এই আইন সংস্কার করে একটি মার্জিত রূপ দেয়া হয়েছে। ‘কপিরাইট কী’ ও ‘কপিরাইট কেন’ এই প্রশ্নগুলো আমরা পারতপক্ষে জানতে চাই না বরং একে আমরা ঝামেলা মনে করি। কপিরাইট সম্পর্কে সাহিত্যপ্রণেতাগণ যেমন উদাসীন, তেমনি উদাসীন প্রকাশনাশিল্পের কর্ণধাররাও। এটি সাহিত্যের জন্য একটি অশনিসংকেতই বটে।

আমরা সস্তায় কোনো জিনিস পেলে বেশি দাম দিয়ে সেই জিনিস কিনতে কুণ্ঠিত হই, কিন্তু একথা আমরা ভেতরে ভেতরে ঠিকই লালন করি যে, সস্তার তিন অবস্থা। কপিরাইট সাহিত্য, সাহিত্যকর্মের স্বত্বাধিকারী, সাহিত্যগ্রন্থ প্রকাশক ও সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। আমরা কপিরাইট চিহ্নিতযুক্ত বই ব্যবহার না করে যদি পাইরেটেড বই কিনে নিজেদের সাহিত্যানুরাগী বা সাহিত্যবোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করি তাহলে আমরা মানুষের কাছে হাস্যকর হয়ে উঠব এবং পরিণামে ধ্বংসের মুখোমুখি হব। যদি আমরা সেই ভয়ংকর পরিস্থিতির হাত থেকে রক্ষা পেতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদের কপিরাইট সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। বিশুদ্ধ চিত্তে সাহিত্যকে ভালোবাসতে হবে। সাহিত্যের মূল্য অর্থ দিয়ে বিচার করা যায় না। যদিও সাহিত্যের বই আমরা অর্থ দিয়েই খরিদ করে থাকি।

মানুষের মানবীয় গুণাবলি পরিপুষ্ট হয় সাহিত্যের অমৃত রস পান করে। সাহিত্যকে দূরে রেখে কিছুতেই আমরা একটি সুন্দর ও সুখী সমাজের স্বপ্ন দেখতে পারি না। আজকের দিনে সাহিত্যকে অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচাতে হলে কপিরাইট অনুসরণ করা সময়ের দাবি। সাহিত্যের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও সাহিত্যকর্মের সঙ্গে জড়িত সকলের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে কপিরাইটের বিকল্প নেই। বিশুদ্ধ সাহিত্যকে বিকৃতির হাত থেকে উদ্ধার করতে হলে আমাদের কপিরাইটের শরণাপন্ন হওয়া আজ ভীষণ জরুরি। আসুন সাহিত্য ও কপিরাইট সম্পর্কে সচেতন হই।

সভাপতি : বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি।